Today |

আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রহসন: দায়, কৃতিত্ব এবং যোগাযোগের মনস্তত্ত্ব

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রহসন: দায়, কৃতিত্ব এবং যোগাযোগের মনস্তত্ত্ব


মানব সভ্যতার বিকাশে শ্রমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ তার শ্রমের মাধ্যমেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। কিন্তু যখন সেই শ্রম এবং তার স্বীকৃতিকে পদ্ধতিগতভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তখন অস্তিত্বের এক গভীর সংকট তৈরি হয়। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক করপোরেট কাঠামো নিছক কোনো উৎপাদন কেন্দ্র নয়; এটি বরং ক্ষমতার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক রঙ্গমঞ্চ। আলোচ্য বিষয়বস্তুটি বাহ্যিকভাবে দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রের একটি সাধারণ হতাশার চিত্র বলে মনে হতে পারে। তবে গভীর দার্শনিক দৃষ্টিতে বিচার করলে, এটি আধুনিক দাসত্ব এবং পদ্ধতিগত মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়নের এক নিখুঁত রূপরেখা।

এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য বর্তমান করপোরেট কাঠামো এমন এক জটিল যোগাযোগের গোলকধাঁধা তৈরি করেছে, যেখানে 'কৃতিত্বের অধিগ্রহণ' এবং 'দায়ের অবদমন'-এর মাধ্যমে কর্মীকে সুপরিকল্পিতভাবে আত্মবিশ্বাসহীন করা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি এবং দ্বিমুখী নীতির যাঁতাকল কর্মীর নিজস্ব সত্তা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে। পরিশেষে এটি তাকে একটি স্তব্ধ, বিচ্ছিন্ন ও যান্ত্রিক পুতুলে পরিণত করে। এটি এমন এক প্রহসন, যেখানে সত্য ও যুক্তির কোনো স্থান নেই, বরং ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির একমাত্র সত্য।

এই কাঠামোতে সাফল্য সবসময়ই ব্যক্তিগত, কিন্তু ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ সামাজিক। একটি কাজের ফলাফল নেতিবাচক হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার অবলীলায় কর্মীর কাঁধে চাপানো হয়। অপরদিকে, কাজটি সফল হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্লজ্জভাবে সেই কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেন। বস যখন তার ঊর্ধ্বতনকে বলেন যে কাজটি "তার পরামর্শে" বা "তার চাপে পড়ে" সম্পন্ন হয়েছে, তখন তিনি মূলত অধস্তনের মেধা ও সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। এটি নিছক কৃতিত্ব চুরি নয়, বরং অধস্তনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ায় কর্মীর সাথে প্রতিষ্ঠানের মানসিক চুক্তি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ঊর্ধ্বতনদের এই ধরনের কৃতিত্ব আত্মসাৎ করার প্রবণতা কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটায়।

অধস্তন কর্মী অপারেটরে ফোন দিলে তাকে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে বলা হয়। আবার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালে তাকে অপারেটরে ফোন না দেওয়ার জন্য ভর্ৎসনা করা হয়। এটি কোনো সাধারণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা নয়; এটি কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের মানসিক কারসাজি বা 'গ্যাসলাইটিং'। প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় একে অন্যের অনুভূতি ও বাস্তবতাকে তুচ্ছ প্রমাণের কৌশল বলা যায়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন যেখানে অধস্তন কর্মী কখনোই সঠিক হতে পারেন না। এই দ্বিমুখী ফাঁদ কর্মীর মনে গভীর আত্মসন্দেহ তৈরি করে, এবং তিনি ভাবতে বাধ্য হন যে প্রতিটি ত্রুটি সম্ভবত তার নিজেরই।

সবচেয়ে মর্মান্তিক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বটি তৈরি হয় যখন কর্মীকে বাধ্য করা হয় বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে। কল দিয়ে কোনো সাড়া না পাওয়ার পর কর্মী সত্য কথাটি বলতে পারেন না। তাকে বলতে হয়, "স্যার আপনাকে কল দিয়েছিলাম কিন্তু আপনি হয়তো ব্যস্ত ছিলেন তাই পিক করতে পারেন নাই।" এটি এক ধরনের বাধ্যতামূলক আত্ম-প্রবঞ্চনা। ক্ষমতার এই অসম সমীকরণে অধস্তনকে তার নিজের কণ্ঠস্বর হরণ করে এমন একটি ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়, যা কেবল ক্ষমতাধরের অহংকারকে তুষ্ট করে। কর্মীর নিজের সত্যকে প্রকাশ করতে না পারার এই অবদমিত আবেগ শেষ পর্যন্ত তাকে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের দিকে ঠেলে দেয়।

কর্মী হয়তো একটি ভালো কাজের রিপোর্ট দেওয়ার জন্যই যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু তাকে শুনতে হয় তিনি কেবল "সমস্যা" নিয়ে আসেন। এই কাঠামোতে অধস্তনের কোনো ইতিবাচক সত্তা থাকতে পারে না। বসের অযোগ্যতা এবং সময়ের অভাবের দায়ভারও কর্মীর ওপর চাপানো হয়। কর্মীকে এখানে একটি সর্বজনীন 'বলির পাঁঠা' বানানো হয়, যার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক সকল ব্যর্থতার বোঝা চাপিয়ে ঊর্ধ্বতনরা নিজেদের নিষ্কলুষ প্রমাণ করেন।

অন্তর্নিহিত বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক রূপক ও প্রতীকের সন্ধান পাওয়া যায়। আধুনিক কর্মক্ষেত্রের এই রূঢ় বাস্তবতাকে আমরা কয়েকটি নির্দিষ্ট কাঠামোগত রূপকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারি:

করপোরেট মিথস্ক্রিয়া মনস্তাত্ত্বিক রূপক অন্তর্নিহিত অর্থ ও প্রভাবহোয়াটসঅ্যাপ বনাম ফোন কলের দ্বিমুখী নীতি অন্তহীন গোলকধাঁধা

কর্মীকে অনন্তকাল এক বিচার বা প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়, যার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। নিয়মগুলো কেবল ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির সুবিধার্থে পরিবর্তিত হয়।
বসের "সব সময় অনলাইনে" থাকার দাবি অদৃশ্য নজরদারি

বস দূর থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি কর্মীর মনে ভীতির সঞ্চার করেন, কিন্তু নিজে থাকেন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে।
মেসেজ না দেখা এবং কর্মীকে দোষারোপ করা যোগাযোগের শূন্যতা বার্তাটি এমন এক গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয় যেখানে শোনার কেউ নেই। এটি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের চরম বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।
"আপনি হয়তো ব্যস্ত ছিলেন" বলতে বাধ্য করা দ্বিমুখী মনস্তত্ত্ব নিজের জানা সত্যকে অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া। এটি কর্মীর স্বাধীন সত্তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে।
নিজের ভুলের দায় কর্মীর ওপর চাপানো সর্বজনীন বলির পাঁঠা

সিস্টেমের সকল ত্রুটি ও ব্যর্থতার পাপ কর্মীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ক্ষমতাবানরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখেন।

এই রূপকগুলো প্রমাণ করে যে আলোচ্য পরিস্থিতি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। এটি একটি সুগভীর কাঠামোগত সংকট, যা মানুষের মনস্তত্ত্বকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

এই বাস্তবতাকে যদি আমরা বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি, তবে এটি স্পষ্ট হয় যে এই ধরনের করপোরেট সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে চরম আত্মঘাতী।

গবেষণা প্রমাণ করে যে, এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কারসাজি বা নিপীড়নমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কর্মীদের মানসিক নিরাপত্তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। একটি কার্যকর সংগঠনে মানসিক নিরাপত্তা হলো সেই পরিবেশ, যেখানে কর্মীরা ভুল করতে, প্রশ্ন করতে এবং নতুন ধারণা প্রকাশ করতে নিরাপদ বোধ করেন। কিন্তু আলোচ্য প্লটে কর্মীকে প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে রাখা হয়। যখন কর্মীদের মানসিক নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন তারা প্রতিরক্ষামূলক নীরবতার আশ্রয় নেন। তারা ঝুঁকি নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং উদ্ভাবনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

বর্তমান সময়ের নিরিখে এই পরিস্থিতির প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী করপোরেট জগতে আজ 'নীরব পদত্যাগ' (Quiet Quitting) নামের একটি বড় ধারণার উদ্ভব হয়েছে। যখন কর্মীরা উপলব্ধি করেন যে তাদের অতিরিক্ত শ্রমের কোনো স্বীকৃতি নেই এবং উল্টো তাদের ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নেন। তারা কেবল ততটুকুই কাজ করেন যতটুকু না করলেই নয়। এ ধরনের বিষাক্ত পরিবেশ কর্মীর মানসিক সম্পদকে প্রতিনিয়ত নিঃশেষ করে দেয়, ফলে তারা আবেগগত শূন্যতায় ভোগেন এবং নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে সম্পদ সংরক্ষণের চেষ্টা করেন।

এই মানসিক কারসাজির কারণে কর্মীদের মাঝে তীব্র উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং এমনকি ঘুম বঞ্চনার মতো শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। ক্রমাগত মানসিক চাপ এবং বসের মেজাজ সামলাতে গিয়ে কর্মীর কাজের প্রতি একাগ্রতা নষ্ট হয়। তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করেন। ফলশ্রুতিতে, প্রতিষ্ঠানে মেধা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাছাড়া, কৃতিত্ব চুরির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে উদ্ভাবনকে গলা টিপে হত্যা করে। যে প্রতিষ্ঠান তার অধস্তনদের মেধার অবমূল্যায়ন করে এবং চাটুকারিতাকে উৎসাহিত করে, তা ধীরে ধীরে মেধাশূন্য হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি কোনোভাবেই পেশাদারিত্ব নয়। দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক করপোরেট কাঠামোর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা এক গভীর ও অন্ধকার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির নিখুঁত চিত্রায়ণ। এটি এমন এক পরাবাস্তব জগৎ, যেখানে যোগাযোগ কোনো অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি করে না, বরং শোষণের একটি নিপুণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। কৃতিত্বের নির্লজ্জ চুরি, দায়বদ্ধতা থেকে ঊর্ধ্বতনদের পলায়নপরতা এবং অধস্তনকে বাধ্যবাধকতার অদৃশ্য শৃঙ্খলে আটকে রাখার এই প্রহসন মানুষের সৃজনশীলতা ও আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করে।

এই বিষাক্ত সংস্কৃতি কর্মীকে কেবল একজন আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করে না, বরং তার মানবিক আবেগকে পিষ্ট করে তাকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে নিক্ষেপ করে। আধুনিক করপোরেট সভ্যতা যদি কেবল উৎপাদনশীলতা ও মুনাফার দোহাই দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক নিপীড়নকে বৈধতা দিতে থাকে, তবে অচিরেই এই কাঠামোগুলো এমন এক যান্ত্রিক মরুভূমিতে পরিণত হবে যেখানে স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ার কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের মর্যাদাকে অস্বীকার করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; এটিই আধুনিকতার সবচেয়ে বড় এবং রূঢ় সত্য।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default